ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি। এর আগে গত ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে। শুরুতেই প্রতিপক্ষকে কঠাক্ষ করে বক্তব্যে উত্তাপ ছড়িয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে সমাবেশের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের প্রচার শুরু করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রথমদিনেই তিনি সিলেট ছাড়াও একাধিক নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য দেন। বক্তব্যে তিনি সরাসরি না হলেও জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। দলটির বিরুদ্ধে তিনি ‘মিথ্যাচার’, মানুষকে ‘ঠকানো’ ও ‘শিরকি’ করার অভিযোগ এনেছেন। এমনকি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কথাও টেনে আনেন তারেক রহমান।
মধ্যপ্রাচ্যসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এনআইডি কার্ড ও মোবাইল নম্বর নিয়ে নারীদের ‘একটি দল বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত করছে’ বলে অভিযোগ করেন বিএনপি নেতা মি. রহমান। কোনো দলের নাম উল্লেখ না করলেও বিএনপি চেয়ারম্যানের বক্তব্যে ইঙ্গিত রয়েছে।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা দেখেছি গত ১৫-১৬ বছর জনগণের ভোট ডাকাতি হয়েছে, এখন এই দেশে বর্তমানে আরেকটি রাজনৈতিক দল তারা এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।’
এছাড়াও, তারেক রহমান বলেন, ‘নির্বাচনের আগেই একটি দল এই দেব, ওই দেব বলছে, টিকিট দেব বলছে…। বেহেস্তের মালিক আল্লাহ…। যেটার মালিক মানুষ না, সেটা দেওয়ার কথা যদি বলে, তাহলে তো শিরকি হচ্ছে। সবকিছুর ওপরে আল্লাহ’র অধিকার। কাজেই তারা আগেই তো আপনাদের ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পরে তাহলে কেমন ঠকান ঠকাবে বোঝেন এবার।’
মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ‘মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার সময় অনেকের ভূমিকা আমরা দেখেছি।’
এদিকে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে ঢাকা থেকে। মিরপুর-১০ নম্বরের আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সমাবেশে জামায়াতে আমির ডা. শফিকুর রহমান ‘আমি কারো সমালোচনা করতে চাই না’ বললেও ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘ভোট ডাকাতদের কারণে গত ১৭ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেননি এবং দেশের মানুষ নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চান না’।
তিনি বলেন, ‘আর এই দেশে ফ্যাসিবাদের ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ এখন যদি নতুন কোনো জামা পরে সামনে আসে, ৫ অগস্ট যে পরিণতি হয়েছিল, সেই নতুন জামা পরা ফ্যাসিবাদের একই পরিণতি হবে।’
এছাড়া, ‘চাঁদাবাজি, দখল-বাণিজ্য, মামলাবাজি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, পাথর মেরে লোক হত্যা, গাড়ি চাপা দিয়ে লোক হত্যা, এগুলো থেকে যারা নিজের কর্মীকে বিরত রাখতে পারবে না, তারা যত রঙিন স্বপ্নই দেখাক, জাতি তাদের মতলব বুঝতে পারবে,’ বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রচারণার দ্বিতীয় দিন তার নির্বাচনী এলাকা খুলনার ফুলতলায় সমাবেশে বলেন, ‘একটি বড় রাজনৈতিক দলের নেতা জামায়াতে ইসলামীকে কুফরি ও শিরকের অভিযোগ করে যে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অজ্ঞতাপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন, তা শুধু রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন নয়, বরং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সরাসরি অবমাননা।’
তিনি বলেন, ‘আল্লাহ, রাসূল (সা.), ফেরেশতা, পরকাল ও তাকদিরে বিশ্বাসী কোনো মুসলমানকে কুফরি বলার অধিকার কারও নেই। হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ব্যক্তি অন্য মুসলিমকে কাফের বলে, সেই অপবাদ তার নিজের ওপরই বর্তায়। ইসলাম সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান ও গবেষণা ছাড়াই এমন মন্তব্য একটি মুসলিম দেশের রাজনৈতিক নেতার জন্য চরম লজ্জাজনক।’
এই বক্তব্যে জনগণ বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছে বলে তিনি দাবি করে তিনি বলেন, ‘ইসলামী এলেম না থাকলে এসব কথা বলা যায়।’
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পূর্বে অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী একা ছিল না। মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, পিডিপি এবং বামপন্থী কমিউনিস্ট দলসহ বহু রাজনৈতিক দল সে সময় ভারতীয় আগ্রাসনের আশঙ্কা থেকে ভিন্ন রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েছিল।’ তিনি ইতিহাস বিকৃত না করার অনুরোধ জানান।
এনসিপি নেতা সারজিস আলম বলেন, ‘যারা দিনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের কথা বলে কিন্তু রাতে চাটুকারদের দিয়ে প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করে, যারা নির্বাচনের আগে দু’মাস জনদরদি হয়ে ওঠে আর নির্বাচনের পর চার বছর ১০ মাস খুঁজে পাওয়া যায় না এমন মানুষদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘কিছু মানুষ নিরপেক্ষ প্রশাসনের কথা বললেও রাতের আঁধারে প্রশাসনকে প্রভাবিত করে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করে। শ্রমিকের সন্তানকে শ্রমিক বানিয়ে রেখে নিজের সন্তানকে বিদেশে পড়াতে পাঠায়। এদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’
জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বলেন, ‘দেশে আসার পূর্বে যারা দিল্লির কাছে দস্তখত দেয় তাদের কাছে বাংলাদেশ নিরাপদ নয়। জাতীয় পর্যায়ের নেতারা নির্বাচনী বৌতরণী পার হতে একে অন্যের দোষারোপ করছেন। প্রচারণার দ্বিতীয় দিন তার উত্তাপ আছড়ে পড়েছে সারা দেশে। বিএনপি ও জামায়াত এবং অন্যান্য দলের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারাও নানা প্রকার আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিচ্ছেন।’
এদিকে জাতীয় নেতাদের বক্তব্যের সূত্র ধরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সোশ্যাল মিডিয়ায়ও শুরু হয়েছে পাল্টা-পাল্টি প্রচারণা, যার উত্তাপ নির্বাচনী পরিবেশেও পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
খুলনা গেজেট/এএজে

